পশ্চিমবঙ্গের বাজেট: বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যানের হাতবাক্স (পর্ব ১)


DEBJANI BHATTACHARYYA

পশ্চিমবঙ্গের বাজেট বাজেট কম রাজনৈতিক বক্তৃতা বেশি। পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রডাক্টের বৃদ্ধির যে হার ঘোষণা করে থাকেন, কেন্দ্রের Central Statistics Office এর ডেটায় পশ্চিমবঙ্গের GSDP গত সাত আট বছর ধরেই তা থেকে গড়ে প্রায় ২ শতাংশ কম থাকে। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের GSDPর বৃদ্ধির হার আদতে তত নয়, যতটা রাজ্য প্রজেক্ট করে। CSOর ডেটার সঙ্গে রাজ্যের ডেটার এই অমিল রাজ্যের মানুষের জন্য বেশ অস্বস্তিকর। (নীচের টেবিল)

GSDP (Constant) Growth % WB Budget GSDP (Constant) Growth % – CSO
2012-13 5.6 4.2
2013-14 6.5 3.0
2014-15 9.0 2.8
2015-16 5.9 6.1
2016-17 8.0 7.9
2017-18 11.5 9.1

উপরন্তু রাজ্যের অর্থমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের GSDPর বৃদ্ধির হারকে প্রতি বছর তুলনা করেন ভারতের GDP’র বৃদ্ধির হারের সঙ্গে। এই তুলনা অনুচিত। ২০১৯-২০ তে পশ্চিমবঙ্গের প্রজেক্টেড্ GSDP 13,14,529 কোটি আর এই পিরিয়ডে ভারতের প্রজেক্টেড্ GDP 149.79 লক্ষ কোটি। পশ্চিমবঙ্গের GSDP যেখানে গোটা দেশের GDPর সাড়ে এগারো ভাগের একভাগ মাত্র, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের GSDPর বৃদ্ধির হার যদি গোটা দেশের GDPর বৃদ্ধির হারের দ্বিগুণও হয়, তবে সেই হারকে খুব তাৎপর্যপূর্ণরকমভাবে বেশি বলা যায় কি? উপরন্তু ডেটা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের GSDP’র বৃদ্ধির হার রাজ্যের প্রজেক্টেড হারের চেয়ে বাস্তবে কম।

অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ভারতের অর্থনীতির সমালোচনা করেছেন stagflation বলে। বলেছেন বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধিও মন্থর হয়েছে, আবার মুদ্রাস্ফীতির সমস্যাও রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী যা বলেন নি, তা হল ২০১৮ সালে মুদ্রাস্ফীতির হারে পশ্চিমবঙ্গ সব রাজ্যকে টেক্কা দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির হার হয়েছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ—৭.৩৭%, যেখানে ২০১৪-১৯ এ গোটা দেশের গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৪.৫%. অর্থাৎ ইনফ্লেশন পশ্চিমবঙ্গে কম নয়। বরং জাতীয় গড়ের চাইতে বেশি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ গর্ব করে বলে যে ১০০ দিনের কাজে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে এক নম্বরে। এই তথ্য কতখানি গর্বের আর কতখানি লজ্জার সে প্রশ্ন অতি প্রাসঙ্গিক। এই তথ্যের প্রকৃত অর্থ হল, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীন মানবসম্পদের এক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ মূলতঃ কর্মহীন। সেই কারণেই ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি আইনের আওতায় ১০০ দিনের কাজে তাদের যোগদান অধিক।

MNREGA প্রকল্পের উপভোক্তাদের টাকা কেন্দ্রীয় সরকার তাদের জনধন অ্যাকাউন্টে ডায়রেক্ট বেনেফিট ট্রান্সফার বা DBT করতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার MNREGA উপভোক্তাদের নাম ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য কেন্দ্রকে পাঠাতে রাজী হয় নি। MNREGA’র অনুদান কেন্দ্রের থেকে এলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা বন্টনের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখেছে এবং সেখান থেকে উঠেছে দুর্নীতি ও তছরূপের প্রশ্নও।

MNREGA প্রকল্পের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান সমালোচনাটি হল, এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। পশ্চিমবঙ্গ MNREGA’য় দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে। তার ফলেই সম্ভবতঃ পশ্চিমবঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির হারও জাতীয় গড় মুদ্রাস্ফীতির হারের তুলনায় বেশি।

মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি হওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন বাজারে। কাঁচাবাজারে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ মুদ্রাস্ফীতি, পশ্চিমবঙ্গে যা বেশি। অর্থাৎ জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির পিছনে রাজ্য সরকারেরও হাত আছে।

অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ভারতের IIP বা ইনডেক্স অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাকশনের তুলনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পবৃদ্ধির হারের সঙ্গে। বলেছেন April-November, 2019 পিরিয়ডে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পবৃদ্ধির হার উক্ত পিরিয়ডে ভারতের IIP’র ছ’গুণ। কিন্তু অঙ্কের দৃষ্টিতে দেখলে এই দুইটি তুলনীয় কিনা, তা‌ অস্পষ্ট। কারণ যথেষ্ট ডেটার অভাবে কনস্ট্রাকশন, গ্যাস ও জলসরবরাহ ইত্যাদি শিল্প সেক্টরগুলির বৃদ্ধি ভারতের IIP হিসেব করার সময় ধরা হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল বৃদ্ধির হার ঠিক কিভাবে হিসেব করা হয়, হুবহু ভারতের IIP হিসেব করার নিয়মেই কি না, সে সম্বন্ধে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। দুটি ইনডেক্সের ফরম্যাট যদি এক না হয়, তবে ভারতের ইনডেক্স অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাকশনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পবৃদ্ধির হারের তুলনা করা অঙ্কের নিয়মে ভুল ও বিভ্রান্তিকর। পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা এমন নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যে পরিপূর্ণ।

বিভ্রান্তির অপর একটি উদাহরণ হল, অর্থমন্ত্রী বলেছেন EoDB বা ইজ অফ ডুয়িং বিজনেসে পশ্চিমবঙ্গ নাকি ফার্স্ট। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও KPMG’র report অনুযায়ী ইজ অফ ডুয়িং বিজনেসে পশ্চিমবঙ্গের স্থান দেশের মধ্যে একাদশ। এই প্রকার নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য এই বাজেট বক্তৃতার বিশেষত্ব।

অমিত মিত্র পশ্চিমবঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে বলে গর্ব করেছেন। রাজ্যবাসী হিসেবে আমরাও গর্বিত। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ডেটাও দেখাচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কৃতিত্ব নরেন্দ্র মোদীর “অ্যাক্ট ইস্ট” নীতির ওপরে মূলতঃ বর্তায় কারণ ২০১৪ য় প্রথম NDA সরকার গঠিত হওয়ার পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উল্লেখ করেছিলেন যে দেশের পূর্বাংশ যদি পশ্চিমাংশের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে অনেকখানি পিছিয়ে থাকে তবে তা গোটা দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির পথেই অন্তরায় হয়। এবং তার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ও নর্থ ইস্টের রাজ্যগুলিতে বিদেশী বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য দেখলে বোঝা যায় NDA1 এর আমলে FDI বৃদ্ধি পেয়েছে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে।

ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যাণ্ড প্রোমোশন, DPIIT’র তথ্য অনুযায়ী April 2000 থেকে June 2019 পর্যন্ত ৯ বছরে পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম ও আন্দামান-নিকোবরে বিদেশী পুঁজি লগ্নি হয়েছে প্রায় ৩৭,০০০.০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে, অমিত মিত্র বলেছেন, ২২,২৬৭ কোটি টাকা লগ্নিকৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। অর্থবর্ষ অনুযায়ী দেখলে দেখা যাবে যে ২০১১-১৬’য় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম টার্মে পশ্চিমবঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগের তুলনায় ২০১৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে আসার পরেই বিদেশী বিনিয়োগ লাফিয়ে বেড়েছে। এর কারণ ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসার পর প্রথমে জনধন অ্যাকাউন্ট ও উজ্জ্বলা যোজনার কাজ বেশ খানিক এগিয়ে যাওয়ার পরেই মোদী তাঁর “অ্যাক্ট ইস্ট” নীতির জোরদার প্রয়োগ শুরু করেন। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের পর থেকে মাত্র দু’বছরে ২৫ গুণ বৃদ্ধি পায় পশ্চিমবঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়োজিত বার্ষিক বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট একটি বাৎসরিক পিকনিক হয়েই রয়ে গিয়েছে। তা থেকে বছরে বছরে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস ছাড়া আর প্রায় কিছুই পাওয়া যায় নি। পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী সে কথা স্বীকার করবেন না।

FY Foreign Investment in West Bengal
2016-17 332 Crores
2017-18 1409 Crores
2018-19 (Dec) 8112 Crores

পশ্চিমবঙ্গের বন্ধ শিল্পগুলির পুনর্শিল্পায়ণ বা re-industrialization আজও করে উঠতে পারে নি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তার জন্য যথেষ্ট প্রয়াসও করা হয় নি রাজ্যসরকারের দিক থেকে। ভাঙ্গরে Powergrid এর কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে অপরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতায়। অপরাজনৈতিক শক্তিকে পরাস্ত করে সে সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেখানে পাওয়ারগ্রিডের হাই টেনসন লাইনের সার্ভে করতে এসে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের পরিচালনায় ভাঙ্গরের লোকেদের হাতে বন্দী হওয়ার মুখে পর্যন্ত পড়েছেন পাওয়ারগ্রিডের লোকেরা। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের সমস্ত উপাদান থাকলেও রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। অমিত মিত্র বাজেট বক্তৃতায় একথা বলেন নি।

বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল 1,93,000.00 কোটি। তৃণমূলের ৯ বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে 4,74,831.00 কোটি। অর্থমন্ত্রী প্রতিবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেন যে বিপুল ধার শোধ করেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যে কথাটি মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেন না সেটি এই যে, যতখানি ঋণের বোঝা বামফ্রন্ট আমলে চেপেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপরে, তৃণমূলের মাত্র ন’বছরের লেজিসলেশনে তা আড়াইগুণ হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ এই লেজিসলেশন যদি চলে তাহলে আরও পাঁচ বছরে ঋণের বোঝা যেখানে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তাতে রাজ্যে অর্থনৈতিক জরুরী অবস্থা এসে যাওয়া অসম্ভব নয়।

কেন্দ্রের অনুদানের টাকা পাওয়ার জন্য নানা প্রকল্পের রূপায়ণে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রদত্ত নিয়মাবলী মেনে চলতে হয়। পরিকল্পনা খাতের টাকা পরিকল্পনা-বহির্ভূত খাতে খরচ করা চলে না বা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা বহির্ভূতভাবে ব্যয় করা চলে না। কিন্তু সদাবিদ্রোহী পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই সকল নিয়ম মেনে চলে না, ফলে অনুদানের টাকা পেতে বিলম্ব হয় বা আটকে যায়। এই বিষয়টিকেই রাজ্যের অর্থমন্ত্রী কেন্দ্রের অসহযোগিতা বলে উল্লেখ করেছেন। আদতে এটি কেন্দ্রীয় অসহযোগিতা নয়, বরং রাজ্যের দিক থেকে ফিসক্যাল ইনডিসিপ্লিন। এই একই ইনডিসিপ্লিন বামফ্রন্ট আমলেও ছিল, এবং বামফ্রন্টও একে বলত “কেন্দ্রের বঞ্চনা”। “সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।“

প্রকল্প খাতে ঘাটতি মেটাতে বর্তমান রাজ্যসরকার ক্রমাগত ঋণ নিয়েছে। ফলে বেড়েই চলেছে পশ্চিমবঙ্গের ফিসক্যাল বার্ডন এবং ক্রমশঃ দুর্বল হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের ফিসক্যাল হেলথ্। অথচ কেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চললে রাজ্যের কোষাগারের হাল ধীরে ধীরে ফিরতে পারত। ঋণের বোঝা এতখানি বৃদ্ধি পেত না।

ভারত সরকার প্রোমোট করতে চাইছে ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে ফিসক্যাল ডিসিপ্লিনও। ভারত তার ঋণের বোঝা কমিয়ে ফেলছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ ছিল ভারতের GDP’র ৫২.২%. ২০১৯ এ এসে সেই ঋণ দাঁড়িয়েছে ভারতের GDP’র ৪৮.৭%. ঋণের বোঝা কমানোর জন্য ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পগুলিতে টাকা খরচ করার জন্য ভারত সরকার নির্ধারিত কিছু নির্দেশিকা অনুসরণ করে চলার ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে ব্যয়িত অর্থ নীতি আয়োগের পরিকল্পনা যথাযথভাবে রূপায়ণ করতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার ফিসক্যাল ইনডিসিপ্লিনের কারণে কেন্দ্রীয় অনুদানের টাকা সময় মত জোগাড় করতে না পেরে রাজ্যের ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়িয়ে ফেলছে।

ভারত সরকার ভারতের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে, আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ” এর নীতি অবলম্বন করে রাজ্যের অর্থনীতির ভিত্তি নড়বড়ে করে ফেলেছে।

নীতি আয়োগের মিটিংগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রায়শঃই উপস্থিত থাকেন না। হয়ত রাজ্যের প্রকল্পগুলির নানা সমস্যা তিনি অন্যান্য সমস্ত রাজ্যের সামনে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে চান না। ফলে রাজ্যের নানা প্রকল্পের বিষয়ে কেন্দ্রের সহযোগিতা পেতে অসুবিধা হয় আর তার কুফল ভোগ করতে হয় রাজ্যকে অর্থাৎ রাজ্যের মানুষকে। পশ্চিমবঙ্গের এই বিপুল পরিমাণ ঋণ শোধ করতে হলে পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে, মেলা, খেলা উৎসবে অপরিমিত ব্যয় সংকোচ করা প্রয়োজন।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ফিসক্যাল ইনডিসিপ্লিনের অপর একটি পরোক্ষ প্রমাণ হল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এরাজ্যে CAG’র প্রসেস অডিটে বাধা দিয়েছেন। CAG’র প্রসেস অডিট হলেই তছরূপের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসে পড়বে। পরিকল্পনা খাতের টাকা যে যথেচ্ছভাবে পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে ব্যয়িত হচ্ছে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। সেটিই সম্ভাব্য কারণ যে মুখ্যমন্ত্রী CAG’র প্রসেস অডিটে বাধা দিয়েছেন।

CAG’র প্রসেস অডিটে বাধা দেওয়ার অপর মুখ্য কারণ সম্ভবতঃ এই যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের বেতনের মহার্ঘ্য ভাতা না দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প চালাচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী কর্মচারীদের বেতন সরকারের সর্বপ্রথম উত্তরদায়িত্ব। CAG প্রসেস অডিট হলে দেখা যাবে কার্যতঃ কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন থেকে বঞ্চিত করে রাজ্য সরকার নানা পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে সেই অর্থ ব্যয় করছে। এইসব বিড়ম্বনা ও তছরূপের দায় এড়াতেই সম্ভবতঃ CAG প্রসেস অডিট আটকে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।

বেতন সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জয়যুক্ত হয়েছেন কর্মচারীরা। কিন্তু কোর্টের রায়ে কর্ণপাত মাত্র করে নি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কর্মচারীরা সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করেছেন, কিন্তু সে বিষয়েও রাজ্য সরকারের কোনো হেলদোল দেখা যায় নি।

ষষ্ঠ পে কমিশনের নামে যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও বাস্তবে একটি দুর্নীতি বলে সন্দেহ করার কারণ আছে। পে কমিশনের চেয়ারম্যান অভিরূপ সরকার যে রিপোর্টটি দিয়েছেন সেটি বাস্তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সপ্তম পে কমিশনের রিপোর্টটিরই প্রায় হুবহু পুনরুপস্থাপনা। ফলে সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে যে রিপোর্ট নকল করতে শ্রী অভিরূপ সরকারের মত অর্থনীতিবিদের চার বছর লাগল কেন। অভিরূপ সরকারের বেতন বাবদ এতগুলি বছরে যে সরকারি অর্থ ব্যয়িত হয়েছে সে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। ষষ্ঠ পে কমিশনের রিপোর্টে চেয়ারম্যান অভিরূপ সরকার উল্লেখ করেছেন যে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ্য ভাতা দিতে রাজ্য সরকার বাধ্য নয়, রাজ্য চাইলে নিজস্ব CLI অনুযায়ী কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতা দিতে পারে। বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান যদিও এই কথা বলেই দায় সেরেছেন, রাজ্যের কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতার হার কি হওয়া উচিত সেটি হিসেব করার পরিশ্রমটি করেন নি। অথচ বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে চার বছর যাবৎ কোন্ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন সে নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্যুরো অব অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স দপ্তরের কাজের অন্যতম হল রাজ্যের কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স হিসেব করা। অতএব রাজ্য সরকারের পক্ষে নিজস্ব ইনডেক্স অনুযায়ী মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া অসম্ভব নয়। বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান সে বিষয়টি সরকারের নজরে এনেছেন কি না তা জানা যায় নি।

মহার্ঘ্য ভাতা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন বেসরকারি কর্মচারীরা যেখানে মহার্ঘ্য ভাতা পান না, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া হবে কেন। মুখ্যমন্ত্রী হয়ত জানেন না যে নিয়োগকর্তা যেহেতু সরকার এবং জিনিসপত্রের দামের ওঠাপড়ার দায়ও যেহেতু সরকারের এবং যে বাজারে জিনিসের দাম সরকারি নীতির প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি হিসেবে বাড়ে সেই বাজার থেকেই জিনিসপত্র কিনতে যেহেতু সরকারি কর্মচারীরা বাধ্য, সেইজন্যই তাঁদের মাইনের ক্রয়ক্ষমতা যাতে অপরিবর্তিত থাকে সেটা সুনিশ্চিত করার জন্য সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া সরকারের ন্যায্য দায়িত্ব ও নিয়ম। মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া মানে  সরকারি কর্মীদের মাইনে বাড়ানো নয়, বরং মাইনের কমে যাওয়াকে রোধ করা। বেসরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রেও বাৎসরিক অ্যাপ্রেইজালের ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধি হয় যদিও বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের তাৎপর্য সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে আলাদা। সরকারি চাকরিতে ইনক্রিমেন্ট হল শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার দাম। তাই তা ন্যূনতম থাকে এবং তার সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক থাকে না। অর্থাৎ নতুন চাকরিতে ঢোকা একজন অনভিজ্ঞ কর্মচারীর চেয়ে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন কর্মচারীর সেই পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার মূল্য হিসেবে পাঁচটি ইনক্রিমেন্ট পাওনা হয়। কিন্তু সেই পাঁচ বছর আগে ঢোকা একজন নতুন অনভিজ্ঞ কর্মচারী যে বেসিক পে চাকরিতে যোগ দেন, তার পাঁচ বছর পরে যদি সেরকমই নতুন অনভিজ্ঞ কেউ সেই একই চাকরিতে যোগ দিতে আসেন, তবে তাঁকেও সেই একই পাঁচ বছরের পুরোনো বেসিক পে’তে চাকরিতে যোগ দিতে হয়। ইতিমধ্যে এই পাঁচ বছরে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি যাই ঘটে থাকুক না কেন, চাকরিতে যোগদানের সময়ের বেসিক পে’তে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রে তা হয় না। বেসরকারি ক্ষেত্রে পাঁচ বছর আগে যে মাইনেতে একজন নতুন অনভিজ্ঞ কর্মচারীকে চাকরিতে নেওয়া হয়, পাঁচ বছর পরে সেই একই চাকরিতে একই যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে নিতে গেলে সাধারণতঃ কোম্পানীরা বেশি মাইনে অফার করতে বাধ্য হন। কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চাকরিতে কোনো ব্যক্তি ২০০৯ সালে কোনো বিশেষ পদে যোগ দেওয়ার সময় যে প্রারম্ভিক বেসিক পে’তে যোগদান করেছিলেন, ২০১৮ সালে সেই একই পদে যোগ দিতে গেলে একই রকম যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির প্রারম্ভিক বেসিক পে একই ছিল। কিন্তু ন’বছরে বাজারমূল্য এক জায়গায় থেমে ছিল না। অথচ ২০০৯ সালের সেই প্রারম্ভিক বেসিক পে’র যা ক্রয়ক্ষমতা ছিল, ২০১৮ সালে সমান বেসিক পে র ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গিয়েছিল। সেই ব্যবধানকে পূরণ করতে বেসরকারি কোম্পানীগুলি ২০০৯ সালে কোনো পদে কর্মচারী নিয়োগ করতে গিয়ে যে প্রারম্ভিক বেতন অফার করত, ২০১৮ সালে সেই একই চাকরিতে একই যোগ্যতাসম্পন্ন লোক নিয়োগ করতে গিয়ে অনেক বেশি প্রারম্ভিক বেতন অফার করতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি চাকরিতে যেহেতু বেশি প্রারম্ভিক বেসিক পে অফার করার কোনো উপায় নেই, তাই সেই প্রারম্ভিক বেসিক পে’র বাস্তব মূল্যহ্রাস রোধ করতে এবং বাজার মূল্যের ব্যবধান পূরণ করতে যে বাড়তি টাকা ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়, তাকেই বলা হয় মহার্ঘ্যভাতা। অর্থাৎ আদতে বেসরকারি কর্মীরাও মহার্ঘ্য ভাতা পান কিন্তু যেহেতু সেই টাকাটা প্রতি নিয়ত মূল বেতনের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে আর তাকে আলাদা করে রেখে আলাদা নামে ডাকা হয় না, তাই হয়ত মুখ্যমন্ত্রীর মনে হয়েছে যে তাঁরা মহার্ঘ্যভাতা পান না। বাস্তবে বেসরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রতি নিয়ত যে ঘটনা ঘটতে থাকে অর্থাৎ মূল বেতনের সঙ্গে মহার্ঘ্যভাতার মিশে যাওয়া, সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটে দশ বারো বছর পর পর যখন বেতন কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করা হয়। তাই এ ব্যাপারে বলাই যায় যে বেতন পুনর্বিন্যাসের ব্যাপারে বেসরকারি ক্ষেত্রের কর্মচারীরা সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং তাদের মধ্যে তুলনা করার চেষ্টা করা বৃথা। তাছাড়া মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার পিছনে বেসরকারি কোম্পানীর যেহেতু কোনো হাত নেই, তাই বেসরকারি নিয়োগকর্তারা মূল্যবৃদ্ধির ক্ষতিপূরণ তাঁদের কর্মচারীদের দিতে বাধ্য থাকেন না। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ বেসরকারি কোম্পানীই প্রতি বছর তাদের কর্মচারীদের বেতন পুনর্বিবেচনা করে থাকেন। আর সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগকর্তা যেহেতু সরকার নিজে, এবং মূল্যবৃদ্ধির দায়ও যেহেতু সরকারের, তাই সরকারকে মহার্ঘ্য ভাতা দিতে হয়। অর্থাৎ মহার্ঘ্য ভাতা মানে মাইনে বাড়ানো নয়, মাইনে কমে যাওয়া আটকানো।

গত চার বছরের মহার্ঘ্য ভাতা না পাওয়ায় এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীদের মাইনে কমে গিয়েছে। আইনতঃ যে কাজের জন্য যে মাইনে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং রাজ্যপালের কাছ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের মাধ্যমে পেয়ে তাঁরা চাকরিতে ঢুকেছিলেন, এই মুহূর্তে সেই একই কাজ করার জন্য তাঁদের বহু কম মাইনেতে কাজ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁরা সঠিক মাইনে পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার আইন অমান্য করছে তার কর্মচারীদের বঞ্চিত করে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের গ্রাস করেছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। বহু কর্মী চাকরি ছাড়তে চাইছেন, কিন্তু সরকার ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের অনুমোদন দিতে চাইছে না।

২০২০র জানুয়ারী মাস থেকে বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতনক্রম কার্যকর হওয়ার পর দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীদের বেতনের স্লিপে মহার্ঘ্য ভাতার কলামটিই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বেতনে মহার্ঘ্য ভাতার কোনো উল্লেখ মাত্র নেই। অথচ জিনিসপত্র মহার্ঘ্য হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, অথচ মহার্ঘ্য ভাতা ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা যে ক্রমশঃ কমে যাবে সে বিষয়ে সরকার সংবেদনশীল নয়। বেতন দেওয়ার সঙ্গতি না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচিত ছিল কর্মী-সংকোচনের উদ্দেশ্যে এই বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ভলান্টারি রিটায়ারমেন্টের কোনো প্রকল্প ঘোষণা করা যাতে রিটায়ারমেন্ট নিতে ইচ্ছুক কর্মীরা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে। তার পরিবর্তে তাদেরকে জোর করে কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য করে বেআইনি ও অমানবিক পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজ্য সরকার।

এ বিষয়ে আবার উল্লেখ করা প্রয়োজন যে পশ্চিমবঙ্গে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার গোটা ভারতের গড় মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি। এবং মুদ্রাস্ফীতি যেহেতু সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়, ফলে পশ্চিমবঙ্গ যদি নিজস্ব Cost of living index হিসেব করতে যায়, তবে এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতার হার কেন্দ্রীয় হারের চাইতে বেশি হবে। সেই কারণেই হয়ত রাজ্য সরকার অনৈতিক ও বেআইনিভাবে রাজ্য সরকারী কর্মচারীদের বঞ্চিত করছেন। উপরন্তু অর্থনৈতিক গতিমন্থরতার সময় সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য বকেয়া মহার্ঘ্য ভাতা দিয়ে দিলে সেই অর্থ রাজ্য তথা দেশের অর্থনীতিকে বেশ খানিক চাঙ্গা করতে পারত। কারণ মধ্যবিত্তের হাতে খরচযোগ্য টাকা এলে সে টাকা অর্থব্যবস্থার সমস্ত স্তরে বন্টিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত বিতর্কিত বা বিতর্কের উদ্রেক করার সম্ভাবনা সমৃদ্ধ বিষয়গুলিকে পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় প্রত্যাশিতভাবেই সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন।

বামফ্রন্টের সঙ্গে তৃণমূলের একটি বিশেষ পার্থক্য এই যে পাওয়ার সেক্টরের সংস্কার সাধন ব্যতীত রাজ্যের উন্নয়নে বামফ্রন্ট আর প্রায় তেমন কিছুই করে নি। তেমন কোনো সামাজিক প্রকল্পেও হাত দেয় নি। কিন্তু তৃণমূল কিছু প্রকল্প রূপায়ন করেছে। বেশ কিছু পরিকাঠামো গঠনের কাজও তারা করেছে। কিন্তু সেসব করতে গিয়ে পদ্ধতিগতভাবে তারা এতটাই স্বেচ্ছাচারী ও অগণতান্ত্রিক হয়েছে যে সামাজিক উন্নয়নের নামে রাজ্যের কোষাগারের হাল বেহাল হয়ে পড়েছে। রাজ্যে আইনের শাসন ব্যক্তির শাসনে পরিণত হয়েছে। অমিত মিত্র তাঁর বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে সমালোচনা করেছেন যে গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে ভারত অন্যান্য সমস্ত দেশের মধ্যে ১০ ধাপ নেমে গিয়েছে। অর্থমন্ত্রী যা চেপে গিয়েছেন তা হল এই যে ভারতবর্ষে যদি গণতন্ত্রের অবনতি হয়ে থাকে তবে তার পিছনে ভারতের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের অবদান নিশ্চিতভাবেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেশি কারণ এ রাজ্যে বিরোধী রাজনীতি করার অপরাধে মরতে হয়েছে অজস্র মানুষকে। তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স ২৪ এর কম। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে যা চলছে তা যে গণতন্ত্র নয় সে কথা বললে অতিকথন হয় না।

পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজন এমন একটি লেজিসলেশন যেটি গণতান্ত্রিকভাবে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয়ে চলবে, তাতেই পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ভাগ্য ফেরার সম্ভাবনা। দলতন্ত্র ও ব্যক্তিতন্ত্র পশ্চিমবঙ্গের অসুখের মূল কারণ। প্রকৃত ইতিবাচক ও সমন্বয়পূর্ণ গণতন্ত্রই এ অসুখ সারাতে পারে। নজর থাকতে হবে রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের দিকে, ভোটব্যাঙ্কের দিকে নয়। (ক্রমশঃ)

Leave a Reply